কোন এক মাকে কবিতা – আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

কোন এক মাকে কবিতা কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ’র অমর রচনা। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ বাংলা কবিতার জগতে এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর বহুল পঠিত কবিতা “কোন এক মাকে” শুধুমাত্র একটি কাব্যসৃষ্টি নয়, এটি বাঙালির আবেগ, দেশপ্রেম ও সংগ্রামের এক অনন্য দলিল।

কবিতার প্রেক্ষাপট ও বিষয়বস্তু

“কোন এক মাকে” কবিতাটি এক অসহায় মায়ের বেদনাবিধুর চিত্র তুলে ধরে, যিনি তাঁর সন্তানকে হারিয়েছেন। তবে এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত শোকের চিত্রায়ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের চিরচেনা এক বাস্তবতাকে তুলে ধরে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, অপূর্ণ স্বপ্ন এবং হারানোর বেদনা—সবকিছুই এই কবিতায় মিশে আছে।

মাতৃত্ব ও দেশপ্রেমের মিশ্রণ

কবিতার মা শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি নন, তিনি প্রতীক। তিনি সেই মা, যিনি নিজের সন্তানকে দেশের জন্য উৎসর্গ করেছেন, যিনি শোকের মধ্যেও এক অদ্ভুত দৃঢ়তা ধরে রাখেন। এভাবে, কবিতাটি মাতৃত্ব ও দেশপ্রেমের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।

ভাষা ও শৈলী

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর লেখনীতে সহজবোধ্য অথচ গভীর ভাষার ব্যবহার লক্ষণীয়। তাঁর শব্দচয়ন ও বর্ণনারীতি এমন যে, পাঠকের হৃদয়ে তা স্থায়ী দাগ কাটে। কবিতাটি আবেগের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, পাঠক যেন নিজ চোখেই সেই মাকে দেখতে পান, অনুভব করতে পারেন তার বেদনা।

প্রাসঙ্গিকতা ও আবেদন

“কোন এক মাকে” আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবার, দেশের জন্য আত্মত্যাগ এবং মায়ের ভালোবাসা—এই উপাদানগুলো কখনও পুরনো হয় না। এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উজ্জীবিত করে এবং পাঠকদের মনে এক গভীর আবেগের সঞ্চার করে।

এই কবিতাটি আমাদের শিখিয়ে যায়, শোকের মধ্যেও শক্তি থাকে, হারানোর মধ্যেও এক নতুন প্রত্যয়ের জন্ম হয়। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এই কবিতার মাধ্যমে আমাদের জাতীয় ইতিহাস ও মানবিক অনুভূতির এক অনন্য সংমিশ্রণ সৃষ্টি করেছেন, যা যুগ যুগ ধরে বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

 

কোন এক মাকে কবিতা – আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

 

‘কুমড়ো ফুলে ফুলে
নুয়ে পড়েছে লতাটা,
সজনে ডাঁটায়
ভরে গেছে গাছটা,
আর, আমি ডালের বড়ি
শুকিয়ে রেখেছি—
খোকা তুই কবে আসবি!
কবে ছুটি?’

চিঠিটা তার পকেটে ছিল,
ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।

‘মাগো, ওরা বলে,
সবার কথা কেড়ে নেবে
তোমার কোলে শুয়ে
গল্প শুনতে দেবে না।
বলো, মা, তাই কি হয়?
তাইতো আমার দেরী হচ্ছে।
তোমার জন্য কথার ঝুড়ি নিয়ে
তবেই না বাড়ী ফিরবো।
লক্ষ্মী মা রাগ ক’রো না,
মাত্রতো আর কটা দিন।’

‘পাগল ছেলে’ ,
মা পড়ে আর হাসে,
‘তোর ওপরে রাগ করতে পারি!’

নারকেলের চিঁড়ে কোটে,
উড়কি ধানের মুড়কি ভাজে
এটা সেটা আরো কত কি!
তার খোকা যে বাড়ী ফিরবে!
ক্লান্ত খোকা!

কুমড়ো ফুল
শুকিয়ে গেছে,
ঝ’রে প’ড়েছে ডাঁটা;
পুঁইলতাটা নেতানো,—
‘খোকা এলি?’

ঝাপসা চোখে মা তাকায়
উঠোনে, উঠোনে
যেখানে খোকার শব
শকুনিরা ব্যবচ্ছেদ করে।

এখন,
মা’র চোখে চৈত্রের রোদ
পুড়িয়ে দেয় শকুনিদের।
তারপর,
দাওয়ায় ব’সে
মা আবার ধান ভানে,
বিন্নি ধানের খই ভাজে,
খোকা তার
কখন আসে! কখন আসে!

এখন,
মা’র চোখে শিশির ভোর,
স্নেহের রোদে
ভিটে ভরেছে।

 

কোন এক মাকে কবিতা আবৃত্তিঃ

 

 

Leave a Comment