পানি দূষণ রচনা । Essay on water pollution । প্রতিবেদন রচনা

পানি দূষণ রচনা: মানুষের অসাবধানী কাজের ফলে পানিতে নানা কিছু মিশে পানি দূষিত হয়। খালি চোখে দেখা যায় না এমন রোগজীবাণু বা ক্ষতিকর পদার্থ এতে মিশে থাকতে পারে।আমাদের দেশে কিছু কিছু নলকূপের পানিতে আর্সেনিক নামক বিষাক্ত পদার্থ মিশে আছে। আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলে হাত পায়ের চামড়ায় ঘা হতে পারে।

পানি দূষণ রচনা

ভূমিকা:

বিশ্বজুড়ে চার ভাগের তিন ভাগই পানি। আর পানির অপর নাম জীবন। তাই পানির অভাবের কারণে জীবন বিপন্ন হবার কথা নয়। কিন্তু জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পানি যখন নানা কারণে দূষিত হয় তখন মানুষ বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে । বাস্তবে দিনের পর দিন তাই ঘটছে। পৃথিবীর মােট পানির শতকরা নিরানব্বই ভাগই ব্যবহারের অনুপযােগী হয়ে পড়েছে মারাত্মক পানিদূষণের কারণে ।

পানিদূষণের উৎস:

সুপ্রাচীনকাল থেকেই মানুষ পানি ব্যবহার করে আসছে ইচ্ছেমতাে। সে সময় পানিদূষণের মতাে পরিবেশগত বিপত্তি দেখা দেয়নি কখনাে। কেননা সংশােধিত পদ্ধতিতেই পানি ব্যবহার উপযােগী ও বিশুদ্ধ থাকত। কিন্তু আধুনিক সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে পানিদূষণের মাত্রা দিন দিন বেড়ে চলেছে। পানিদূষণ দু ভাবে হতে পারে। প্রথমত, প্রাকৃতিক উপায়ে; দ্বিতীয়ত, মানুষের মাধ্যমে । এ দুটোর মধ্যে মানুষই পানিদূষণের জন্য বেশি দায়ী ।

পানি দূষণ রচনা পানি দূষণ রচনা । Essay on water pollution । প্রতিবেদন রচনা

বাংলাদেশে পানিদূষণ:

বাংলাদেশে পানিদূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌছেছে। যেসব ক্ষেত্র থেকে এ দূষণ ঘটছে তার মধ্যে প্রধান হলাে:

১. টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা গ্রহণযােগ্য পরিমাণের চেয়ে বেশি হওয়ায় কোটি কোটি মানুষ আর্সেনিকজনিত রােগে আক্রান্ত হয়।

২. শিল্পোৎপাদন কেন্দ্র, কলকারখানা ইত্যাদি থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্যের বিষক্রিয়ায় পানি দূষিত হয়।

৩, বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্পকারখানার শতকরা ৯০ ভাগই রাজধানী ঢাকার জনবহল হাজারিবাগ এলাকায়।

8. এসব ট্যানারি থেকে নির্গত তরল ও কঠিন বর্জ্যে বুড়িগঙ্গা নদীর মাছ, জলজ জীব ইত্যাদি বিলীন হতে চলেছে। বিষাক্ত গন্ধ ও গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। অপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে জলাশয়গুলােতে ছড়িয়ে পড়ছে মালবাহিত জীবাণু।

৫. শিল্পবর্জ্য ছাড়াও শহরের ময়লা, হােটেল-রেস্তোরা ও বাসাবাড়ির আবর্জনা পানিতে মিশে পানিদূষণ ঘটাচ্ছে।

৬. কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশক ও রাসায়নিকের ব্যবহার পানিদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। কৃষিক্ষেত্র থেকে বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে কীটনাশকের বিষ পুকুর, নদী প্রভৃতি জলাশয়ে গিয়ে পড়ে এবং পানিদূষণ ঘটে।

৭. জলাশয়গুলাের পানিদূষণের ফলে দেশের বড় বড় শহরগুলােতে ওয়াসার পানিতে ক্ষতিকর রােগজীবাণুর উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

পানির দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব:

এভাবে নানা উপায়ে পানিদূষণ পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করছে। আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি চামড়ার ক্যান্সারসহ নানা রােগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেকে পঙ্গু হয়ে পড়ছে। এমনকি মৃত্যুর মতাে ঘটনাও ঘটছে। পানির ক্ষতিকর জীবাণু টাইফয়েড, ডায়রিয়া, জন্ডিস, কৃমি, আমাশয় ইত্যাদি রােগের জন্য দায়ী।

দূষিত পানির প্রভাবে লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ মরে যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলজ প্রাণী এ ধরনের পানি ব্যবহারের ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ বিভিন্ন ধরনের চর্মরােগ ও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, জমির কীটনাশক পানিতে মিশে যাওয়ায় মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে এবং পর্যায়ক্রমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঘটাচ্ছে।

পরােক্ষভাবে এ ধরনের রাসায়নিক গ্রহণের ফলে মানবদেহে এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। ক্যান্সার, পক্ষাঘাত, লিভার ও কিডনির সমস্যা, পেটের পীড়া প্রভৃতি রােগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে। এমন সব রােগে যার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ সম্পর্ক রয়েছে পানিদূষণের।

পানি দূষণ রচনা । Essay on water pollution

পানিদূষণ প্রতিরােধে করণীয়:

পানিদূষণের ফলে সুপেয় পানির সংকট দেখা দেয়। ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পানি অনুপযােগী হয়ে পড়ে। এ সংকট নিরসনে পানিদূষণের উৎস ও কারণগুলাে চিহ্নিত করে পানিদূষণমুক্ত করার জন্য প্রয়ােজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী ভূগর্ভস্থ পানি আর্সেনিক মুক্ত করা, বিকল্প পানি সরবরাহ প্রভৃতি বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি পানিদূষণ প্রতিরােধে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার— প্রথমত, শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য অপসারণে বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া।

দ্বিতীয়ত, শহরের ট্যানারিগুলাের বর্জ্য শােধনব্যবস্থা । প্রয়ােজনে ট্যানারিগুলােকে শহরের বাইরে স্থানান্তর । তৃতীয়ত, ক্ষতিকর বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার থেকে বিরত থাকা।চতুর্থত, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। পঞমত, পানিকে দূষণমুক্ত রাখতে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি।

উপসংহার:

পানি সম্পদের প্রাচুর্যে বাংলাদেশ সমৃদ্ধ। এখানে ভূগর্ভস্থ পানি যেমন রয়েছে তেমনি ভূপৃষ্ঠের পানিও প্রচুর। সেই সাথে রয়েছে কৃষি, শিল্প ও গৃহস্থালি কাজে পানির ব্যাপক চাহিদা। কিন্তু ভয়ানক পানিদূষণ যেভাবে মানুষের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে তাতে সকল মহল সচেতন না হলে এবং প্রয়ােজনীয় পদক্ষেপ না নিলে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পানির অপর নাম মরণ নয়, পানির অপর নাম জীবন।

Leave a Comment