মহাস্থানগড় রচনা । Essay on Mohashangor । প্রতিবেদন রচনা ও সাধারণ জ্ঞান প্রশ্নোত্তর

মহাস্থানগড় রচনাঃ পুরাকীর্তি দেশের অতীতকালের ইতিহাস বহন করে। পুরাকীর্তি যে সাক্ষ্য তুলে ধরে তার ওপর ভিত্তি করে সে দেশের সভ্যতার মান নির্ণীত হয়। এমনি এক পুরাকীর্তি মহাস্থানগড়। বগুড়া জেলার ইতিহাস-প্রসিদ্ধ করতোয়া নদের তীরে এই ঐতিহ্যবাহী মহাস্থানগড় অবস্থিত।

মহাস্থানগড় রচনা

ভূমিকা :

একটি দেশের পুরাকীর্তি সেই দেশের অতীতকালের সাক্ষ্য বহন করে । দেশটি কত উন্নত ছিল , তার কৃষ্টি – সংস্কৃতি কত উৎকর্ষলাভ করেছিল , সে সম্পর্কে সে দেশের পুরাকীর্তি যে সাক্ষ্য তুলে ধরে তার ওপর ভিত্তি করে সে দেশের সভ্যতার মান নির্ণীত হয় ।এমনি একটি পুরাকীর্তির পরিচয় বহন করে আমাদের দেশের বগুড়া জেলার মহাস্থানগড় ।

অবস্থান :

বগুড়া জেলার ইতিহাস – প্ৰসিদ্ধ করতোয়া নদীর তীরে এবং ঢাকা – দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে এই ঐতিহ্যবাহী মহাস্থানগড় অবস্থিত । সমতল ভূমি থেকে এর গড় উচ্চতা প্রায় ২০–২৫ ফুট । প্রাচীন যুগের বহু ধ্বংসাবশেষ এখানে বিদ্যমান । বিভিন্ন সময়খনন করে এ গড় থেকে পাথর , মূর্তি , শিলা , ঘরবাড়ি এবং বিভিন্ন আমলের মুদ্রা পাওয়া যায় । মহাস্থানগড় যে পুরাকীর্তির একটি অন্যতম নিদর্শনস্থল তা স্পষ্ট বোঝা যায় ।

মহাস্থানগড়ের ইতিহাস :

অতি প্রাচীনকালে ‘ পুরাজ্য ‘ নামে এক রাজ্য ছিল । এই পুরাজ্যের সীমানার মধ্যে ছিল রংপুর , দিনাজপুর , পাবনা , রাজশাহী , বগুড়া , বালুরঘাট , মালদহ , কুচবিহার প্রভৃতি স্থান । এই রাজ্যে এক এক সময় এক এক রকমের নামকরণ করা হয়েছিল ।কখনাে হয়েছিল বরেন্দ্রভূমি , কখনো বা গৌড়রাজ্য । উত্তর বঙ্গের নাম ছিল পুণ্ড্রবর্ধন ।

রামায়ণ – মহাভারতেও পুণ্ড্রবর্ধনের নাম উল্লেখ আছে । শশাঙ্ক নামে এক বাঙালি রাজা এক সময় পুরাজ্য দখল করে নিজ রাজ্যভুক্ত করেন । তিনি মালদহ জেলারগৌড়ে প্রধান রাজধানী স্থাপন করেন । তখন পুণ্ড্রবর্ধন প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে । পরশুরাম নামে এক হিন্দুরাজা পুণ্ড্রবর্ধনের রাজা ।

ছিলেন । ইতিহাস – বিখ্যাত মহাস্থানগড় রাজা পরশুরামের আমলেই সমৃদ্ধি লাভ করে ।মহাস্থানগড় ছিল করতোয়া নদীর তীরে একটি মনোরম স্থান । এ স্থানটিকেই রাজা পরশুরাম রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করতেন ।হিজরী ৪৪০ সনে হযরত শাহ সুলতান ইব্রাহিম বলখী মাহীসওয়ার ( র ) ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এখানে আগমন করেন ।

অতঃপর ধাপ – সুলতানগঞ্জ নামক স্থানে তিনি আস্তানা । স্থাপন করেন । এখানে ইসলাম প্রচারের সময় তাঁর সঙ্গে রাজাপরশুরাম ও তাঁর ভগ্নি শীলাদেবীর ভীষণ যুদ্ধ হয় । যুদ্ধে রাজা পরশুরাম নিহত হন এবং তাঁর ভগ্নি শীলাদেবী মন্দিরের পেছনদরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়ে করতোয়া নদীতে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন ।

এর ফলে এখানকার অগণিত লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণকরে । ৪৪৭ হিজরী সনে শাহ সুলতান মাহীসওয়ার ( র ) এখানে ইন্তেকাল করেন । এখানে তার মাজার রয়েছে । সুলতানসাহেবের মাজারের নিচেই তার প্রধান খাদেমের কবর রয়েছে । এখানে আরেকজন দরবেশের মাজার আছে , তার নাম ছায়াতপুর।

গড়ের একটু দক্ষিণে দরবেশে বোরহান উদ্দিনের মাজার । তারপর গোকুলের ম্যাড , বেহুলা সুন্দরী ও লক্ষ্মিন্দরের বাসর ঘরেরধ্বংসাবশেষ ; পশ্চিমে কালিদহ সাগর ও বাসোনিয়া সওদাগরের বাড়ি , উজানি – ভাইটালি নগর । এছাড়া উল্লেখযোগ্য স্থান হচ্ছে– শীলাদেবীর ঘাট ও রাজা পরশুরামের সভাগৃহের ধ্বংসাবশেষ । শীলাদেবীর ঘাট হিন্দুদের তীর্থস্থান ।

এখানে প্রতি বছর মেলা বসেএবং গঙ্গাস্নান করা হয় । পরশুরাম রাজার জীয়তপ একটি আশ্চর্যজনক কূপ । কথিত আছে যে , এ কূপের পানি দিয়ে নাকি মৃতব্যক্তিকে বাঁচানো যেত । বস্তুতপক্ষে , শীলাদেবীর জন্যেই আজ মহাস্থানগড় হিন্দুদের তীর্থস্থান এবং শাহ সুলতানের জন্যেমুসলমানদের অন্যতম পবিত্র স্থান । মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ :

১। বৈরাগীর ভিটা :

মহাস্থানগড়ে পাল আমলের বৈরাগীর ভিটা নামক দুটি বড় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়েছে । বৈরাগীর ভিটা পটি তিনশ ‘ ফুট দীর্ঘ এবং ছাব্বিশ ফুট প্রস্থ । চারদিকের সমতল ভূমি থেকে উচ্চতা দশ ফুট । মন্দিরগুলো ছিল কারুকার্য খচিত ইট নির্মিত যাসহজেই অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয় । বৈরাগীর ভিটার কিছু দূরে বহুকক্ষবিশিষ্ট একটি মন্দির রয়েছে । মন্দিরের মাঝ দিয়েস্নানাহীদের চলাচলের পথ । এখানে রাজকীয় অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি সম্পাদিত হতো।

২। মুনীর ঘোন :

শীলাদেবীর ঘাট সংলগ্ন মুনীর ঘোন ’ নামে একটি দুর্গ প্রাচীর রয়েছে । দুর্গটি উত্তর – দক্ষিণে প্রায় ১০০ ফুট লম্বা । উচ্চতা ১০ফুট এবং চওড়া প্রায় ১১ ফুট । অনুমান করা যায় যে , দুর্গ প্রাচীরটি পাল যুগে নির্মিত হয়েছে । প্রত্ন বিশেষজ্ঞদের ধারণা , এ দুর্গপ্রাচীরটি নদীপথের ওপর দৃষ্টি রাখার জন্য প্রহরীদের সুবিধার্থে তৈরি করা হয়েছিল ।

৩। গোবিন্দ ভিটা :

গোবিন্দ ভিটার মন্দির মহাস্থানগড় দুর্গ প্রাচীরের বহির্দেশে উত্তর পাশে অবস্থিত । গোবিন্দ ভিটা বিষ্ণুমন্দির ‘ নামে পরিচিত ।এটি সম্ভবত খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ বা সপ্তম শতকে গুণ্ডামলে গড়ে তোলা হয় । গোবিন্দ ভিটার মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে ছিল দেবী । গোবিন্দভিটা প্রাচীন বাংলার অন্যতম কারুকার্য খচিত স্থাপত্যের নিদর্শন । এ ভিটায় তাম্র – ব্রোঞ্জের বিভিন্ন প্রকার অলঙ্কার , পোড়ামাটির মূর্তি এবং বিভিন্ন তৈজসপত্র পাওয়া গিয়েছে ।

৪। খোদার পাথর ভিটা :

খোদার পাথর ভিটার স্থানীয় নাম খোদার পাথর ঢিবি।তবে পূর্বে এর নকশা দেখে নামকরণ করা হয়েছিল । খোদার পাথর ঢিবি ।মূলত এটি হচ্ছে বৌদ্ধ মন্দিরের এক ধ্বংসাবশেষ যা ছিল পূর্বমুখী । গোটা মন্দিরটি অবশ্য ২৪ ফুট x ১৫ ফুট আয়তনের । এরমাঝে যে পাথরের আবিষ্কার হয় তার আয়তন ৯ ফুট ৪ ইঞ্চি x ২ ফুট ৪ ইঞ্চি x ২ ফুট ৫ ইঞ্চি । খোদার পাথর ভিটার বৌদ্ধ মন্দিরদেখে অনুমান করা চলে যে , এখানে একসময় বৌদ্ধ সমাজ ও সংস্কৃতির প্রভাব ছিল ।

৫। পরব্রামের প্রাসাদ ও সভাবাটী :

এই প্রাচীন প্রাসাদের আয়তন ২০০ ফুট x ১০০ ফুট । কথিত আছে যে , এটি হচ্ছে মহাস্থানগড়ের সর্বশেষ হিন্দু রাজা পরশুরামেররাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ । খোদার পাথর ভিটা থেকে যে বিস্তৃত রাস্তাটি মথুরা গ্রাম ও বসুবিহার পর্যন্ত প্রসারিত তারই পাশেঅবস্থিত পরশুরামের সভাবাটী । কথিত আছে , এখানেই পরশুরাম তার রাজসভার কাজ পরিচালনা করতেন । পরশুরামছিলেন হিন্দু রাজা । তাই ওই সময়ে মহাস্থানগড়ে হিন্দু সমাজ ও সংস্কৃতির প্রভাব থাকা অস্বাভাবিক ছিল না।

৬। শীলাদেবীর ঘাট :

কথিত আছে যে , মহাস্থানগড়ের সর্বশেষ হিন্দু রাজা পরশুরামের শীলাদেবী নামে পরমা সুন্দরী ভগ্নি ছিল । যখন মুসলমানগণরাজা পরশুরামকে পরাজিত ও নিহত করে তখন শীলাদেবী মুসলমানদের হাতে বন্দী হন । তবে তিনি নাকি নিজ মর্যাদা রক্ষার্থেবিজয়ী মুসলমান দরবেশকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে করতোয়া নদীতে আত্মবিসর্জন দেন । যে স্থানে শীলাদেবী নদীতে ঝাপ দিয়েআত্মহত্যা করেন সেটিই শীলাদেবীর ঘাট নামে পরিচিত ।

৭। লক্ষ্মীন্দরের মেধ :

বাংলাদেশের অন্যতম চিত্রাকর্ষক লোক কাহিনীর নায়ক – নায়িকা বেহুলা – লক্ষ্মীন্দরের নামে একটি ধ্বংসস্তূপের এমন নামকরণকরা হয়েছে । মূল মহাস্থানগড় থেকে এক মাইল দক্ষিণ – পশ্চিম প্রায় ৪৩ ফুট উঁচু এক ঢিবির ওপর মেধ মন্দিরটি অবস্থিত ।ধ্বংসাবশেষ দেখে অনুমান করা হয়েছে যে , এটি বৌদ্ধদের একটি কেন্দ্রীয় উপাসনালয় ছিল ।

বর্তমান অবস্থা মহাস্থানগড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে বহুসংখ্যক প্রাচীন নিদর্শন । প্রায় তিন হাজার বছর আগে থেকে শুরু করে । মুসলিম যুগের শেষপর্যন্ত বহু নিদর্শন প্রত্নতাত্ত্বিকগণ খননকার্যের মাধ্যমে আবিষ্কার করেছেন । এসব দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় যে , সত্যিই মহাস্থানগড় একটি ইতিহাস – প্রসিদ্ধ স্থান ।

উপসংহার :

সুদূর অতীতের স্মৃতি বুকে ধরে মহাস্থানগড় ইতিহাসের পাতায় ঘুমিয়ে থাকলেও মানুষ তাকে ভোলেনি । আজও বহু পর্যটক , বহুগবেষক এবং বনভোজন পার্টির আনাগোনায় ও ভিড়ে মহাস্থানগড় চঞ্চলতা ও আনন্দ – উল্লাসে মুখরিত । দেশের প্রাচীনঐতিহ্যের গরিমা সমুন্নত রাখার প্রয়োজনে এসব পুরাকীর্তির যথাযথ তত্ত্বাবধান খুবই প্রয়োজনীয়।

মহাস্থানগড় সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন: মহাস্থানগড়ের পুরাতন নাম কি?

উঃ পুণ্ড্রবর্ধন

প্রশ্ন: বাংলাদেশের প্রাচীন শহর কোনটি?

উঃ পুন্ড্রবর্ধন। বর্তমানে মহাস্থানগড়।

প্রশ্ন: মহাস্থানগড় কোথায় অবস্থিত?

উঃ বগুড়া।

প্রশ্ন: খোদার পাথর ভিটা কোথায় অবস্থিত?

উঃ মহাস্থানগড়।

প্রশ্ন: বৈরাগীর ভিটা কোথায় অবস্থিত?

উঃ মহাস্থানগড়।

প্রশ্ন: সোনারগাঁর পূর্বে বাংলার রাজধানী কোথায় ছিল?

উঃ মহাস্থানগড়।

Leave a Comment