ট্রেনে ভ্রমণ রচনা: ভ্রমণ হলাে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বেড়ানাে বা পর্যটন। ভ্রমণ সর্বদাই আনন্দের। এই আনন্দের সঙ্গে ভ্রমণে যুক্ত হয় জ্ঞানলাভ ।ভ্রমণের ফলে মানুষের চিত্ত যেমন প্রফুল্ল হয় ঠিক তেমনি সে অনেক অজানার সন্ধান লাভ করে।
Table of Contents
ট্রেনে ভ্রমণ রচনা
ভূমিকা:
বৃটিশ-ভারতে স্থলপথে যােগাযােগের সবচেয়ে সময় সাশ্রয়ী মাধ্যম ছিল রেল । ব্রিটিশরা তাদের নানা প্রয়ােজনে সমস্ত ভারতবর্ষে রেলপথ নির্মাণ করে চালু করেছিল । কালক্রমে ভারতবর্ষ ভেঙে ভারত, পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ- এই তিনটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয় । তখনও রেলই ছিল স্থলপথে যােগাযোগের মাধ্যম ।
হাল আমলে সড়ক পথের উন্নয়ন হয়ে রেলের ওপর কিছুটা চাপ কমেছে। তবুও যােগাযােগের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে রেল এখনাে সমান জনপ্রিয় । আমার জীবনে একটি দীর্ঘ রেল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে— যা মনে করে এখনাে আমি সম্যক আনন্দ লাভ করি ।
ট্রেন ভ্রমণের উপলক্ষ্য:
আমার স্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি হয়েছে। আমার মেজ ফুফ থাকেন খুলনায় আর আমার অবস্থান রাজশাহীতে। কাজেই মেজ ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা করলেই রেল ভ্রমণ অগ্রাধিকার পায়। আমি আমার মনের এ ইচ্ছের কথা মাকে জানালাম । কিন্তু মা আমার কথা খুব একটা গ্রাহ্য করলেন না।
অগত্যা আমি ছােটো মামাকে ধরলাম বিষয়টি সুরাহা করার জন্য। মামা খুব ভালাে করে মাকে বােঝালেন। তবে একটা শর্ত জুড়ে দিলেন; আমাকে মামার সঙ্গে যেতে হবে । তাতে আমার কোনাে আপত্তি থাকার কথা নয়, কারণ মামা সঙ্গে গেলে আমার সময়টা আরও ভালাে কাটবে।
ট্রেন ভ্রমণের প্রস্তুতিপর্ব:
দিনক্ষণ ঠিক হলাে আমাদের ভ্রমণের । আমার তাে কোনােভাবেই দেরি সহ্য হচ্ছিল না। মামা গেলেন। স্টেশনে টিকিট কাটতে । রেলে দিন দিন যাত্রী বাড়ছে, তাই একটু আগেভাগে টিকিট না কাটলে সিট পাওয়া যায় না। কপােতাক্ষ ট্রেনের টিকিট কেটে এনে মামা আমার হাতে দিলেন— গ বগির ২৭ ও ২৮ নম্বর সিট আমাদের, সময় সকাল ৬.৪৫ মিনিট।
আমার আনন্দের মাত্রা আরও বেড়ে গেল। ব্যাগ গােছাতে শুরু করলাম; মনে করে সব তুললাম। আমার ফুফাতাে ভাই অনীকের জন্যে একটা উপহার কিনেছি; সেটা রাখলাম ব্যাগে সবার ওপরে। মাও ফুফুর জন্য কিছু জিনিস দিলেন। সেগুলাে অবশ্য মামার ব্যাগে জায়গা পেল।
ট্রেন স্টেশনের দৃশ্যঃ
আমাদের বাড়ি থেকে স্টেশন খুব দূরে নয়। রিকশায় আমরা স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। প্রায় ১৫
মিনিট পর আমরা রাজশাহী স্টেশনে নামলাম। এই স্টেশনটিকে একবারে নতুন করে সাজানাে হয়েছে। ছাদের ওপর ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস লাগানােয় সম্পূর্ণ আলাে স্টেশনের ভেতরে পড়ছিল।
মােট ১০টি প্লাটফর্ম আছে এ স্টেশনে যার মধ্যে ৬টিতে ট্রেন প্রতিদিন যাতায়াত করে। স্টেশনের ভেতরে বিশুদ্ধ পানি খাবার সুন্দর ব্যবস্থা আছে । তাছাড়া স্টেশনটিও বেশ পরিষ্কার । তবু কিছু মানুষ খাবারের ঠোঙা এদিক-ওদিক ফেলল । আমার খুব খারাপ লাগল ওই দৃশ্য দেখে ।
ট্রেন ভ্রমণের পথ:
আমাদের ভ্রমণ পথ বেশ দীর্ঘ। উত্তরবঙ্গ পেরিয়ে ট্রেন দক্ষিণবঙ্গে যাবে। আব্দুলপুর জংশন পার হয়ে পাবনা বাইপাস হয়ে আমরা ঈশ্বরদী জংশনে পৌছলাম । মামা ঈশ্বরদী জংশনের ইতিহাস আমাকে বললেন; শুনে অবাক হয়ে গেলাম । স্টেশনে একটি ট্রেন দাঁড়ানাে দেখলাম । মামা বললেন ওটি মৈত্রী এক্সপ্রেস।
দেখলাম ট্রেনের গায়ে ভারত ও বাংলাদেশের পতাকা আঁকানাে রয়েছে । ঈশ্বরদীতে ওই ট্রেনের চেকিং হয়; তাই দাড়িয়েছে। খুব মজা পেলাম দেখে । এরপর আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত কুষ্টিয়ায় পৌছলাম। দর্শনা আসতেই ট্রেনে ভিড় বেড়ে গেল। মামা বললেন বেনাপােল স্থল বন্দর দিয়ে অনেকেই ভারত ভ্রমণের জন্য যায় ।
তাই এ স্টেশনে এত ভিড়। যশাের স্টেশনে আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিলাম । বার বার মাইকেল মধুসূদন দত্তের কপােতাক্ষ নদ’ কবিতার কথা মনে পড়ছিল ।
বিরতি স্টেশনসমূহের চিত্র:
কপােতাক্ষ আন্তঃনগর ট্রেন হওয়ার পরও বড় স্টেশনগুলােতে যাত্রা ব্রিতি দিচ্ছিল। সেই সুযােগে আমি জানালা দিয়ে স্টেশনগুলাে দেখে নিচ্ছিলাম। প্রথমেই আমার মনে যেটি দাগ কাটল সেটি হলাে মানুষের মুখের ভাষা। অঞল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কী দ্রুত মানুষের মুখের ভাষা পরিবর্তিত হয়ে যায় তা ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম।
যদিও এ বিষয়ে বইতে আগেই পড়েছি তবুও সরাসরি এরকম পরিস্থিতিতে পড়ে বেশ অবাক হয়েছিলাম। কোনাে স্টেশনে মানুষ গিজগিজ করছিল আবার কোনাে স্টেশন ছিল একবারেই শান্ত। তবে স্টেশনগুলােতে ট্রেন থামতেই ফেরিওয়ালারা নানা জিনিস নিয়ে ট্রেনে উঠছিল ।
ট্রেনের ভেতরের দৃশ্য:
নির্দিষ্ট সময় পর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যাত্রীদের টিকিট চেক করতে এলেন । আমার কাছে টিকিট চাইতেই আমি বের করে দিলাম। দেখতে পেলাম দু’জন যাত্রী টিকিট ছাড়াই উঠেছে। তাদের জরিমানা করলেন সাদা পােশাক পরা ব্যক্তিরা । আমার পাশে একটি পরিবার বসেছে; খুব আনন্দ করছে তারা।
ট্রেনের ভেতরের খাবার দেবার ছেলেটি এসে মাঝে মাঝে কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করছিল। তাছাড়া ফেরিওয়ালা, ভিক্ষুক বিভিন্ন সময়ে যাত্রীদের কাছে তাদের আবেদন নিবেদন রাখছিল। তবে একটা লােক খুব সুন্দর গলায় লালন গীতি গাইছিল। আমি আর মামা দুজনেই শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
গন্তব্যে পৌঁছার পর:
প্রায় ৭ ঘণ্টার যাত্রা শেষে আমরা খুলনা স্টেশনে পৌছলাম। দেখি ফুপা আর অনীক স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখেই তারা এগিয়ে এলাে। আমি অনীকের সঙ্গে হাত মেলালাম। ফুপা আমার মাথায় হাত রাখলেন আর। মামাকে অভ্যর্থনা জানালেন। অটোরিকশায় উঠে যেতে যেতে আমি অনীককে আমার অভিজ্ঞতার কথা বললাম। ও শুনে খুব পুলকিত হলাে এবং আমার সঙ্গে রাজশাহী আসবে বলে জানালাে।
রেলগাড়ির রাত্রি:
খুলনা থেকে কপােতাক্ষ ছাড়ে বেলা তিনটায় । ফুপা আমাদের তুলে দিতে এলেন । অনীকও সঙ্গে এসেছিল কিন্তু ও রাজশাহী আসতে পারেনি। ফেরার পথে ট্রেনে রাত হয়ে গিয়েছিল। রাতে ট্রেনের ভেতরে খুব অদ্ভুত লাগছিল। রাস্তাগুলাে দিনের আলােয় আমার মনে আনন্দের সঞ্চার করেছিল সেগুলােই রাতে ভীতির সঞ্চার করছিল। রাত সাড়ে দশটায়। আমি আমার জীবনের প্রথম ট্রেন ভ্রমণ শেষে রাজশাহী স্টেশনে পৌছলাম স্টেশনে এসে দেখি বাবা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন ।
উপসংহার:
আমার জীবনে আনন্দের অনেক মুহূর্ত এসেছে। কিন্তু সেবারের গরমের ছুটির ট্রেন ভ্রমণ যেন আমার কাছে একেবারে জীবন্ত । আজও আমি সুযোগ হলেই সেই ট্রেন ভ্রমণের স্মৃতি রােমন্থন করি । সেবার যদি অনীক আমাদের সঙ্গে আসত তাহলে হয়ত আরও বেশি আনন্দ হতাে। তবে আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমার দেয়া উপহারটা ওর খুব ভালাে লেগেছিল । আসার সময় আমাকেও একটা উপহার দিয়েছিল অনীক যা এখনাে আমার কাছে যত্নে রাখা আছে।
