কাজী নজরুল ইসলামের “কুলি মজুর” কবিতা তাঁর বিদ্রোহী ও মানবতাবাদী কাব্যধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি, যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালে প্রকাশিত সর্বহারা কাব্যগ্রন্থে। এই কাব্যগ্রন্থটি নজরুলের অন্যতম রাজনৈতিক ও সমাজচেতনার প্রতীক, যেখানে তিনি শ্রমিক, কৃষক ও শোষিত মানুষের পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন।
“কুলি মজুর” কবিতায় নজরুল শোষিত-নিপীড়িত শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, বঞ্চনা ও প্রতিবাদের চিত্র অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষায় তুলে ধরেছেন। এখানে কুলি ও মজুরদের করুণ জীবনচিত্র অঙ্কিত হয়েছে—যারা দিন-রাত ঘাম ও রক্ত ঝরিয়ে অন্যের প্রাসাদ, অট্টালিকা ও সভ্যতার সৌধ নির্মাণ করে, অথচ নিজেরা বঞ্চিত থাকে মৌলিক চাহিদা থেকেও।
নজরুল শুধু তাঁদের দুরবস্থার বিবরণ দেননি; তিনি তাঁদের আত্মমর্যাদা জাগ্রত করেছেন, অধিকার সচেতনতার আহ্বান জানিয়েছেন এবং শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কবিতায় শ্রমিক শ্রেণিকে সভ্যতার প্রকৃত নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যারা ছাড়া উন্নতি ও সমৃদ্ধি সম্ভব নয়।
“কুলি মজুর” শুধু শ্রমিক শ্রেণির দুরবস্থার কাব্যিক দলিল নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, সমতা ও শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য এক জাগরণী বার্তা। কবিতাটি প্রকাশের পর থেকেই শ্রমিক আন্দোলনের প্রেরণা জুগিয়েছে এবং আজও এর বার্তা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
Table of Contents
কুলি মজুর কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম
দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!
চোখ ফেটে এল জল,
এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?
যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে,
বাবু সা’ব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে।
বেতন দিয়াছ?-চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল্?
রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে,
রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে,
বল ত এসব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা
কার খুনে রাঙা?-ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি হঁটে আছে লিখা।
তুমি জান না ক’, কিন- পথের প্রতি ধূলিকণা জানে,
ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে!
আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,
তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!
তুমি শুয়ে র’বে তেতালার পরে আমরা রহিব নীচে,
অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে ভরসা আজ মিছে!
সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটির মমতা-রসে
এই ধরণীর তরণীর হাল রবে তাহাদেরি বশে!
তারি পদরজ অঞ্জলি করি’ মাথায় লইব তুলি’,
সকলের সাথে পথে চলি’ যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি!
আজ নিখিলের বেদনা -আর্ত পীড়িতের মাখি’ খুন,
লালে লাল হ’য়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ!
আজ হৃদয়ের জমা-ধরা যত কবাট ভাঙিয়া দাও,
রং-করা ঐ চামড়ার যত আবরণ খুলে নাও!
আকাশের আজ যত বায়ু আছে হইয়া জমাট নীল,
মাতামাতি ক’রে ঢুকুক্ এ বুকে, খুলে দাও যত খিল!
সকল আকাশ ভাঙিয়া পড়-ক আমাদের এই ঘরে,
মোদের মাথায় চন্দ্র সূর্য তারারা পড়-ক ঝ’রে।
সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি’
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশী।
একজনে দিলে ব্যথা-
সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।
একের অসম্মান
নিখিল মানব-জাতির লজ্জা-সকলের অপমান!
মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উত্থান,
উর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নীচে কাঁপিতেছে শয়তান!
কুলি মজুর কবিতার মূলভাব ঃ
কাজী নজরুল ইসলামের “কুলি মজুর” কবিতার মূলভাব হলো—শ্রমজীবী, শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা জাগানো এবং তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করা। কবিতায় কবি শ্রমিকদের জীবনযন্ত্রণা, অবহেলা ও দারিদ্র্যের ছবি তুলে ধরে শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, শ্রমিকরা ঘাম ও রক্ত ঝরিয়ে সভ্যতার অট্টালিকা নির্মাণ করলেও তারা নিজ জীবনে মৌলিক চাহিদা থেকেও বঞ্চিত। কবি শ্রমিকদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে, নিজেদের শক্তি ও মর্যাদাকে চিনতে এবং শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করতে আহ্বান জানিয়েছেন। মূলত, এই কবিতার কেন্দ্রীয় ভাবনা হলো শ্রমের মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন।
কাজী নজরুল ইসলামের “কুলি মজুর” কবিতার ব্যাখ্যা ঃ
“কুলি মজুর” কবিতায় কবি নজরুল এক অনবদ্য কণ্ঠে শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, বেদনা ও শোষণের করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। কবিতায় দেখা যায়—শ্রমিকরা রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে, ঘাম ও রক্ত ঝরিয়ে সভ্যতার অট্টালিকা, সেতু, কারখানা ও শহরের সৌন্দর্য নির্মাণ করে, অথচ তাদের নিজের জীবন থাকে অন্ধকারে নিমজ্জিত। তারা ক্ষুধার্ত, বস্তিতে বাস করে, এবং সমাজে অবহেলিত।
কবি শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশার পাশাপাশি তাদের অন্তর্নিহিত শক্তি ও মর্যাদার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই কুলি-মজুররাই প্রকৃত স্রষ্টা—তাদের পরিশ্রম ছাড়া সভ্যতার চাকা থেমে যাবে। কবি শোষক ও পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রামে আহ্বান জানিয়েছেন।
এই কবিতা কেবল শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদী উচ্চারণ নয়, বরং শ্রমের মর্যাদা ও মানবিক সমতার পক্ষে এক দৃঢ় ঘোষণাপত্র। নজরুল এখানে শ্রমিকদের অবহেলার শৃঙ্খল ভেঙে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, যা আজও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আন্দোলনের জন্য প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক।
কুলি মজুর কবিতা আবৃত্তি ঃ
