স্মৃতিস্তম্ভ কবিতা – আলাউদ্দিন আল আজাদ

স্মৃতিস্তম্ভ কবিতাটি লেখেন বিখ্যাত কবি ও ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক . আলাউদ্দিন আল আজাদ, যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষী ছাত্র ছিলেন। এই কবিতাটি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শহীদ মিনার ভাঙার প্রতিবাদে রচিত, যা সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিশ্রুতির প্রতীক হয়ে ওঠে।

কবিতায় কবি স্মৃতি ও সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে “স্মৃতির মিনার” তুলে ধরেছেন। তিনি জানালেন যে, বেদনা, শোক ও প্রতিবাদের স্মৃতিগুলো এত শক্তিশালী যে শাসকচক্র তাদের ভাঙতে পারবে না। “চারকোটি পরিবার”—মানে সাধারণ মানুষের ঐক্য ও সাহস—ই হবে ভাঙনশীল স্মৃতির প্রকৃত স্তম্ভ।

রক্ত, বেদনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে কবির কণ্ঠস্বর লড়াই-সংগীত; যেখানে শোক নয়, বরং প্রত্যয়ের উজ্জ্বলতা থাকে। এখানে মৃত্যু কোনো ব্যক্তিগত শোক নয়—বরং একটি ঐক্যবদ্ধ প্রজ্ঞার প্রস্ফুটন, যা একটি পতাকায় রূপ নেয় এবং যুগান্তরের সাংকেতিক রূপ হয়।

সংগ্রামী মনোভাব, আত্মবিশ্বাসী স্বাধীন চেতনা ও দৃঢ়সংকল্প এই কবিতাকে শুধু সাহিত্যিক উৎপাদন নয়, বরং ভাষা আন্দোলনের চেতনার এক কবিতাস্বরূপ বানিয়ে তুলে।

 

 

স্মৃতিস্তম্ভ কবিতা – আলাউদ্দিন আল আজাদ

 

স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার ? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো
চারকোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো ! যে-ভিত কখনো কোনো রাজন্য
পারেনি ভাঙতে
হীরের মুকুট নীল পরোয়ানা খোলা তলোয়ার
খুরের ঝটকা ধুলায় চূর্ণ যে পদ-প্রান্তে
যারা বুনি ধান
গুণ টানি, আর তুলি হাতিয়ার হাঁপর চালাই
সরল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য ।
ইটের মিনার
ভেঙেছে ভাঙুক ! ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার আমরা জাগরী
চারকোটি পরিবার ।

এ-কোন মৃত্যু ? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
শিয়রে যাহার ওঠেনা কান্না, ঝরেনা অশ্রু ?
হিমালয় থেকে সাগর অবধি সহসা বরং
সকল বেদনা হয়ে ওঠে এক পতাকার রং
এ-কোন মৃত্যু ? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
বিরহে যেখানে নেই হাহাকার ? কেবল সেতার
হয় প্রপাতের মোহনীয় ধারা, অনেক কথার
পদাতিক ঋতু কলমেরে দেয় কবিতার কাল ?
ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক । একটি মিনার গড়েছি আমরা
চারকোটি কারিগর
বেহালার সুরে, রাঙা হৃদয়ের বর্ণলেখায় ।
পলাশের আর
রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায়
দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন, যুগে যুগে সেই
শহীদের নাম
এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিলায়, তোমাদের নাম ।
তাই আমাদের
হাজার মুঠির বজ্র শিখরে সূর্যের মতো জ্বলে শুধু এক
শপথের ভাস্কর ।

 

 

স্মৃতিস্তম্ভ কবিতার মুলভাব ও ইতিহাস (সংক্ষিপ্ত)ঃ

কুশের ছাত্র হত্যার পর রচিত হয়েছিল একুশের প্রথম বুলেটিন ‘বিপ্লবের কোদাল দিয়ে আমরা অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর কবর রচনা করি’। এখানেই ঠাঁই পেয়েছিলো আলাউদ্দিন আল আজাদের রচিত ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ কবিতাটি। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনেও ঠাঁই পেয়েছিল এই কবিতা।

২১ ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদের মিছিলে গুলি চালনোর প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি আইনসভার সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। ২৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন তিনি। এদিনও সেখানে হাজির ছিলেন আলাউদ্দিন আল আজাদ।  ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে নুরুল আমীন প্রশাসনের নির্দেশে  পুলিশ এসে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল ছাত্রাবাস ঘিরে ফেলে। এরপর আরেকটি ট্রাকে করে ইমারত ভাঙার জিনিসপত্র নিয়ে এসে স্মৃতিস্তম্ভটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।

আলাউদ্দিন আল আজাদ তখন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতেই তিনি ইকবাল হলে বসে লেখেন ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ কবিতাটি। তার কবিতায় কেবল শহীদ মিনার ভাঙ্গার প্রসঙ্গই নয়, উঠে এসেছিল তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দীপ্ত শপথের প্রসঙ্গও।

 

স্মৃতিস্তম্ভ কবিতা আবৃত্তিঃ

 

 

Leave a Comment