“অভিশাপ” কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলামের সঞ্চিতা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত, যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালে। এই কবিতায় কবি শোষণ, অবিচার ও অসাম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে শাসক ও অত্যাচারীদের প্রতি ঘৃণা ও অভিশাপ নিক্ষেপ করেছেন। দুর্বল ও নিরপরাধ মানুষের উপর যারা নির্যাতন চালায়, তাঁদের বিরুদ্ধে নজরুলের এই কবিতা এক জ্বলন্ত অভিসম্পাতের দলিল। এটি নিপীড়িত মানুষের মাঝে আত্মমর্যাদা ও অধিকার সচেতনতার জাগরণ ঘটাতে অনুপ্রেরণা দেয়। ব্যক্তিগত ক্ষোভের গণ্ডি পেরিয়ে কবি এখানে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। তীক্ষ্ণ রূপক, শক্তিশালী ভাষা ও আবেগময় ছন্দের মাধ্যমে “অভিশাপ” হয়ে উঠেছে যুগান্তকারী এক প্রতিবাদী সাহিত্যকর্ম, যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
অভিশাপ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম
যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
ছবি আমার বুকে বেঁধে
পাগল হ’লে কেঁদে কেঁদে
ফিরবে মর” কানন গিরি,
সাগর আকাশ বাতাস চিরি’
যেদিন আমায় খুঁজবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
স্বপন ভেঙে নিশুত্ রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে,
কাহার যেন চেনা-ছোঁওয়ায় উঠবে ও-বুকে ছমকে,-
জাগবে হঠাৎ চমকে!
ভাববে বুঝি আমিই এসে
ব’সনু বুকের কোলটি ঘেঁষে,
ধরতে গিয়ে দেখবে যখন
শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন!
বেদ্নাতে চোখ বুঁজবে-
বুঝবে সেদিন বুজবে।
গাইতে ব’সে কন্ঠ ছিঁড়ে আস্বে যখন কান্না,
ব’লবে সবাই-“ সেই য পথিক তার শেখানো গান না?’’
আস্বে ভেঙে কান্না!
প’ড়বে মনে আমার সোহাগ,
কন্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ!
প’ড়বে মনে অনেক ফাঁকি
অশ্র”-হারা কঠিন আঁখি
ঘন ঘন মুছবে-
বুঝ্বে সেদিন বুঝবে!
আবার যেদিন শিউলি ফুটে ভ’রবে তোমার অঙ্গন,
তুলতে সে ফুল গাঁথতে মালা কাঁপবে তোমার কঙ্কণ-
কাঁদবে কুটীর-অঙ্গন!
শিউলি ঢাকা মোর সমাধি
প’ড়বে মনে, উঠবে কাঁদি’!
বুকের মালা ক’রবে জ্বালা
চোখের জলে সেদিন বালা
মুখের হাসি ঘুচবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
আসবে আবার আশিন-হাওয়া, শিশির-ছেঁচা রাত্রি,
থাকবে সবাই – থাকবে না এই মরণ-পথের যাত্রী!
আসবে শিশির-রাত্রি!
থাকবে পাশে বন্ধু স্বজন,
থাকবে রাতে বাহুর বাঁধন,
বঁধুর বুকের পরশনে
আমার পরশ আনবে মনে-
বিষিয়ে ও-বুক উঠবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
আসবে আবার শীতের রাতি, আসবে না ক আ সে-
তোমার সুখে প’ড়ত বাধা থাকলে যে-জন পার্শ্বে,
আসবে না ক’ আর সে!
প’ড়বে মনে, মোর বাহুতে
মাথা থুয়ে যে-দিন শুতে,
মুখ ফিরিয়ে থাকতে ঘৃণায়!
সেই স্মৃতি তো ঐ বিছানায়
কাঁটা হ’য়ে ফুটবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
আবার গাঙে আসবে জোয়ার, দুলবে তরী রঙ্গে,
সেই তরীতে হয়ত কেহ থাকবে তোমার সঙ্গে-
দুলবে তরী রঙ্গে,
প’ড়বে মনে সে কোন্ রাতে
এক তরীতে ছিলেম সাথে,
এমনি গাঙ ছিল জোয়ার,
নদীর দু’ধার এমনি আঁধার
তেম্নি তরী ছুটবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ,
আমার মতন কেঁদে কেঁদে হয়ত হবে অন্ধ-
সখার কারা-বন্ধ!
বন্ধু তোমার হান্বে হেলা
ভাঙবে তোমার সুখের মেলা;
দীর্ঘ বেলা কাটবে না আর,
বইতে প্রাণের শান- এ ভার
মরণ-সনে বুঝ্বে-
বুঝবে সেদিন বুঝ্বে!
ফুট্বে আবার দোলন চাঁপা চৈতী-রাতের চাঁদনী,
আকাশ-ছাওয়া তারায় তারায় বাজবে আমার কাঁদ্নী-
চৈতী-রাতের চাঁদ্নী।
ঋতুর পরে ফির্বে ঋতু,
সেদিন-হে মোর সোহাগ-ভীতু!
চাইবে কেঁদে নীল নভো গা’য়,
আমার মতন চোখ ভ’রে চায়
যে-তারা তা’য় খুঁজবে-
বুঝ্বে সেদিন বুঝ্বে!
আস্বে ঝড়, নাচবে তুফান, টুটবে সকল বন্ধন,
কাঁপবে কুটীর সেদিন ত্রাসে, জাগবে বুকে ক্রন্দন-
টুটবে যবে বন্ধন!
পড়বে মনে, নেই সে সাথে
বাঁধবে বুকে দুঃখ-রাতে-
আপনি গালে যাচবে চুমা,
চাইবে আদর, মাগ্বে ছোঁওয়া,
আপনি যেচে চুমবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে।
আমার বুকের যে কাঁটা-ঘা তোমায় ব্যথা হান্ত,
সেই আঘাতই যাচবে আবার হয়ত হ’য়ে শ্রান–
আসবে তখন পান’।
হয়ত তখন আমার কোলে
সোহাগ-লোভে প’ড়বে ঢ’লে,
আপনি সেদিন সেধে কেঁদে
চাপ্বে বুকে বাহু বেঁধে,
চরণ চুমে পূজবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
অভিশাপ কবিতার মূলভাব:
কবি বিশ্বাস করেন, যেদিন তিনি আর থাকবেন না, সেদিনই তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে। কবিপ্রিয়া তাঁকে জীবদ্দশায় সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারেননি, তাই তাঁর অবর্তমানে হয়তো অরণ্য, পর্বত, সমুদ্র কিংবা মরুভূমিতে তাঁর খোঁজ করবেন। সেই দিনে অন্তপারের সন্ধ্যাতারার কাছে কবির বার্তা নেওয়ার জন্য দয়িতা ডাক দেবেন, অথচ গভীর রাতে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় তাঁকে খুঁজে ফিরবেন। তখন তিনি হয়তো আবিষ্কার করবেন শূন্য শয্যা ও শূন্য স্বপ্ন। বেদনায় চোখ বুজবেন কবিপ্রিয়া, গানের আসরে বসে কবির গান গাওয়ার অনুরোধে যখন সাড়া দেবেন, তখন তাঁর চোখ জলে ভরে উঠবে।
গাইতে গাইতে বেদনার রাগিণী সৃষ্টি হবে, বেহাগের কান্নায় ভিজবে তাঁর চোখ। মনে পড়বে জীবনের অনেক অপূর্ণতার কথা, কবির সঙ্গে কাটানো মিলনের অনেক সুখস্মৃতি বুকে বিঁধবে। কবির সমাধিক্ষেত্রে ফুল দিতে গিয়ে হাওয়ায় ভেসে আসা আশ্বিনের শিশিরভেজা রাতে তাঁর অন্তরে স্মৃতির দাহন জ্বলে উঠবে। অন্য কারও বাহুবন্ধনে থেকেও প্রেমিকের স্মৃতি ও তাঁর সোহাগমাখা স্পর্শ প্রেয়সীকে বেদনায় ভরিয়ে তুলবে। শীতের কুয়াশা ঢাকা মিলনের মুহূর্তে কবি থাকলে হয়তো সেই সুখানুভূতি পূর্ণতা পেত এবং আরও গভীর হতো
তবুও কবির বাহুবন্ধনের স্মৃতি তাঁকে দগ্ধ করবে। নদীর জোয়ারে ভাসতে ভাসতে তাঁর মনে পড়বে অতীতের সুখস্মৃতির কথা, যা তাঁকে বিদ্ধ করবে এবং কবির আসল মূল্য বুঝতে সাহায্য করবে। কবির অভিশাপ এত দৃঢ় যে তিনি মনে করেন, প্রেয়সীর নতুন নায়ককেও একদিন কারাবাসের দুঃখ ভোগ করতে হবে। তখন হয়তো কবিপ্রিয়ার চোখ কান্নায় অন্ধ হয়ে যাবে, ক্লান্তির ভার বইতে বইতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়বেন, আর মৃত্যুসম যন্ত্রণা তাঁকে গ্রাস করবে।
যেদিন ঝড় আসবে, তুফান গর্জন করবে, সেদিন কবি আর থাকবেন না—তখন কে তাঁকে নিরাপত্তা দেবে? কে সান্ত্বনা দেবে? কবিপ্রিয়া তা জানবেন না। দুঃসময়ের রাতে কবি যেভাবে তাঁকে বাহুবন্ধনে বেঁধে সোহাগের চুম্বনে স্নিগ্ধ করেছিলেন, সেই স্মৃতি তখন তাঁকে গভীর দুঃখে নিমজ্জিত করবে। হয়তো তখনই কবিপ্রিয়া তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন করে নতুন করে প্রেমের সোহাগে ভরিয়ে তুলতে কবিকে খুঁজে ফিরবেন।
অভিশাপ কবিতা আবৃত্তি:
