হেমন্তকাল রচনা: শরৎকাল শেষ হলেই হেমন্তের আগমন। ছয় ঋতুর চতুর্থ ঋতু হলো হেমন্ত যা কার্তিক অগ্রহায়ণ মাসের সমন্বয়ে গঠিত হয়। হেমন্তের শেষে শুরু হয় শীতকাল, তাই হেমন্ত কে বলা হয় শীতের পূর্বাভাস।
Table of Contents
হেমন্তকাল রচনা
ভূমিকা:
প্রকৃতির বৈচিত্র্য জীবনকে করে তোলে বর্ণময়, আর সেই বৈচিত্র্যের রূপ জীবনের একঘেয়েমি দূর করে নতুন রঙে রাঙিয়ে দেয়। বাঙালির সৌভাগ্য যে, আমাদের স্বদেশ বঙ্গভূমিতে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কোনো অভাব নেই। বছরের বারো মাসে ছয় ঋতুতে প্রকৃতির নতুন রূপে নতুন লীলা বাংলার মানুষের জীবনকে অনাবিল স্নিগ্ধ আনন্দে ভরিয়ে তোলে।
হেমন্তের প্রকৃতি:
প্রকৃতির বুকে উৎসবের উত্তেজনার পর স্বস্তির প্রতীক হিসেবে হেমন্তের আগমন হলেও প্রকৃতি এই ঋতুকে প্রাকৃতিক দানের সমারোহ থেকে এতটুকুও বঞ্চিত করেনি। বরং সমগ্র হেমন্তকাল পূর্ণ হয়ে আছে বিভিন্ন প্রকার ফল ফুল ও ফসলের আড়ম্বরে। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় হেমন্তকালে ফোটা বিভিন্ন প্রকার অনিন্দ্যসুন্দর ফুল গুলির কথা। শিউলি, কামিনী, গন্ধরাজ, মল্লিকা, ছাতিম, দেবকাঞ্চন, হিমঝুরি, রাজঅশোক ইত্যাদি ফুলের মাধুর্যে সমগ্র হেমন্তকালের প্রকৃতি যেন মাতোয়ারা হয়ে থাকে।
ফুল ছাড়া মানুষের জীবন যেন রুক্ষ, প্রাণহীন। হেমন্তকাল মানুষের জীবনকে তার ফুলের ডালি উপুর করে দিয়ে সেই রুক্ষতায় নিয়ে আসে পেলবতার ছোঁয়া। অন্যদিকে হেমন্তের পরিবেশ বিভিন্ন প্রকার ফসল চাষের জন্য বিশেষভাবে অনুকুল। এই ঋতুতেই বিশেষভাবে বিকাশ লাভ করে বাঙালির প্রিয় আমন ধান। অন্যদিকে সমগ্র হেমন্তকাল জুড়ে গাছে গাছে শোভা পায় কামরাঙা, চালতা, আমলকি, কিংবা ডালিমের মতন বিভিন্ন ফল। তাছাড়া এই ঋতুর প্রধান ফল হলো নারিকেল।
পরিবেশে হেমন্তের উপলব্ধি:
হেমন্ত নামটি এসেছে হিম শব্দ থেকে। অর্থাৎ হেমন্তের নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। বর্ষার শেষ লগ্ন থেকেই আকাশে কমে আসে মেঘের ঘনঘটা, গোটা শরৎকাল জুড়ে নীল আকাশে ভেসে বেড়ায় পেঁজা তুলোর মতন সাদা মেঘ। হেমন্তের সেই মেঘ আরো কমে আসে। শরতের শেষে কয়েক পশলা বৃষ্টির পর হেমন্তের সকাল গুলিতে অনুভূত হয় হালকা শীতের আমেজ।
মাঠে-ঘাটে ঘাসের ওপর, গাছের পাতার উপর পড়ে থাকতে দেখা যায় শিশির। সমগ্র শরৎকাল জুড়ে উৎসবের উত্তেজনাকে স্তিমিত করে হেমন্ত যেন প্রকৃতির বুকে একরাশ স্বস্তির নিঃশ্বাস। কখনো কখনো হেমন্তকালের বিভিন্ন সময়ে দু-এক পশলা বৃষ্টিও দেখতে পাওয়া যায়। এই বৃষ্টি প্রকৃতপক্ষে হেমন্তের পরবর্তী শীতের আগমনের পটভূমি প্রস্তুত করে। না গরম, না ঠান্ডা- এক অপূর্ব মনোরম পরিবেশ এই সময় মানুষের জন্যও অত্যন্ত আরামদায়ক।
গ্রাম বাংলার হেমন্তকাল:
বাংলার হৃদয় স্বরূপ গ্রাম বাংলা প্রতিটি ঋতুতেই ভিন্ন ভিন্ন রূপে সজ্জিত হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মে তার রূপ এক, বর্ষায় সে অনন্য; শরতের উৎসবে সেই গ্রামবাংলাই হয় তুলনাহীন, আর হেমন্ত সে অপরূপা। হেমন্তের প্রকৃত রূপ এই আধুনিক সভ্যতার যুগে এখন অব্দি প্রত্যক্ষভাবে দেখা যায় গ্রাম বাংলার বুকেই।
হেমন্তের শিশির ভেজা ঘাস, শীতের আগে ঝরে যাবার পূর্বে শেষবারের মতন সজ্জিত হয়ে ওঠা গাছের পাতা গ্রামবাংলায় যেন সকল ঋতুর মধ্যে হেমন্তকেই রানীর মুকুট পরিয়ে দেয়। তাই বলা হয় বসন্ত যদি ঋতুরাজ হয়, তবে নিশ্চিত ভাবেই হেমন্ত হলো ঋতুদের রানী। গ্রাম বাংলার বুকে ভোরের হালকা কুয়াশায় ধানক্ষেতে ধান গাছের উপর জমে থাকা বিন্দুবিন্দু শিশির যেন সমগ্র গ্রামের পরিবেশকেই এক অপরূপ মায়ায় আচ্ছন্ন করে রাখে।
নবান্ন উৎসব:
নবান্ন উৎসবের সূচনা হয় ফসল কাটাকে কেন্দ্র করে। নবান্ন অর্থাৎ নতুন অন্ন বা নতুন খাবার। নবান্ন উৎসব বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। নতুন কাটা ধানের থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষ্যে আয়োজিত হয় এই উৎসব। এই উৎসবে বিভিন্ন ধরনের পিঠা, পায়েস, ক্ষীর জাতীয় সুস্বাদু খাবার তৈরি হয় এবং আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে বিতরণ করা হয়। খাওয়া-দাওয়া ছাড়াও অনুষ্ঠিত হয় অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নানা ধরনের দেশীয় নৃত্য, বাউলগান, লোকগীতি ইত্যাদির ধারা সবাই আনন্দ নে।
উপসংহার:
পরিবেশ দূষণের জন্য বর্তমানে হেমন্তের এই অপরূপ রূপ পৃথিবীর সব জায়গায় প্রত্যক্ষভাবে অনুভূত হয় না। আধুনিক যুগে পৃথিবীতে বাড়তে থাকা দূষণের মাত্রা বাংলার শহরাঞ্চল থেকে হেমন্তকে একরকম মুছেই দিয়েছে। সে কারণেই শহুরে বাঙালি সাধারণভাবে হেমন্তকে আলাদা করে অনুভব করতে পারে না। তবে নিজেদের স্বার্থেই আমাদের বাড়তে থাকায় দূষণের মাত্রাকে কমিয়ে আনতে হবে, প্রকৃতি ও পরিবেশকে করে দিতে হবে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবার সুযোগ। তাহলে একদিকে যেমন প্রকৃতিও হয়ে উঠবে নির্মল, অন্যদিকে শহুরে বাঙালিরাও অপরূপা হেমন্তের রূপ দর্শন থেকে বঞ্চিত থাকবে না।
