যে সমস্ত মানুষ পৃথিবীতে এসে তাদের মহাজীবনের অতি উজ্জ্বল আলাের দ্বারা মানুষের জীবনে কল্যাণের পথটি উদ্ভাসিত করে দেন মহাত্মা গান্ধী সেরূপ একজন মহাপুরুষ। ভারতবাসীকে তিনি এক নবমন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন। তাই তাই তিনি জাতির জনক। তার অপরাজেয় আত্মশক্তি সমগ্র দেশের প্রাণ শক্তিকে জাগ্রত করেছিল। শুধু ভারতবর্ষ কেন সারা বিশ্বের তিনি একজন মহামানব।
Table of Contents
জন্ম ও শিক্ষা:
ইংরেজি ১৮৬৯ সালের ২রা অক্টোবর গুজরাটের অন্তর্গত পােরবন্দরের এক সম্ত্রান্ত বণিক বংশে মহাত্মা গান্ধীর জন্ম। তার পুরাে নাম মােহন দাস করম চাদ গান্ধী। তাঁর পিতার নাম কাবা গান্ধী আর মাতার নাম পুতলিবাঈ। তার পিতা ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়-নিষ্ঠ ও তেজস্বী পুরুষ। আর মাতা ছিলেন ধর্মশীলা।
গান্ধীজী বাল্যকালে অতিশয় ভীরু ও লাজুক প্রকৃতির ছিলেন। গান্ধিজীর বিদ্যা শিক্ষা আরম্ভ হয় দেশীয় বিদ্যালয়ে। দশবছর বয়সে রাজকোটের উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়ে তার উচ্চশিক্ষা শুরু এবং সতের বছর বয়সে প্রবেশিকা পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভবন নগরের শ্যামল দাস কলেজে ভর্তি হন। কলেজে তাঁর বেশিদিন পড়ার সুযােগ হয়নি। দেশীয় প্রথামতে মাত্র তের বছর বয়সে কস্তুরীবাঈয়ের সঙ্গে তার বিবাহ হয়।
ব্যারিস্টারি পাস প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে গান্ধীজী ব্যারিস্টারি পাশ করবার জন্য বিলাত যান এবং ১৮৯০ খৃস্টাব্দে ব্যরিষ্টারি পাশ করে স্বদেশে ফিরে আসেন।
সেখানে তিনি মদ্য-মাংস স্পর্শ বা কোন আচার-বিরাে কার্য করবেন না বলে মায়ের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। আফ্রিকায় থাকা অবস্থায় সে দেশের বর্ণ বিদ্বেষী সরকারের বিদ্ধ সত্যনিষ্ঠ গান্ধীজী দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।
কর্মজীবন :
প্রথমে বােম্বাইয়ে, পরে রাজকোট শহরে তিনি আইন ব্যবসা আরম্ভ করেন। কিন্তু তার প্রকৃতিগত লাজুক স্বভাবের জন্য তিনি আইন ব্যবসায়ে । প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেননি।১৮৯৩ খৃস্টাব্দে একটি জটিল মোকদ্দমার ভার নিয়ে গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকার নাটলে গমন করেন।
তার চেষ্টায় মোকদ্দমা আপসে মীমাংসা হয়ে গেলেও তিনি রয়ে গেলেন সেখানে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের লাঞ্ছনা ও নির্যাতন দেখে তিনি সকল প্রবাসী ভারতবাসীকে সম্মিলিত করে গড়ে তুলেন ‘নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের অধিকার রক্ষার জন্য চালাতে লাগলেন নানাভাবে আন্দোলন।
এর ফলে সেতাঙ্গদের হাতে তাকে নানা প্রকার নির্যাতন ভােগ করতে হয়েছিল।দীর্ঘ একুশ বছর সেখানে বাস করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয়দের অধিকার। এখানেই তার সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সূচনা।
জীবন দর্শনের মূল সূত্র :
গান্ধীজীর জীবনদর্শনের মূল ভিত্তিই সত্যেরপ্রতি মূল নিষ্ঠা। যার সমস্ত শক্তির উৎস ছিল সুগভীর মানবতাবোধ, কর্তব্য নিষ্ঠা ও ধর্মনিষ্ঠতা। গান্ধীজী বিশ্বাস করতেন হিংসা দিয়ে কখনাে হিংসার উগ্রতাকে স্তব্ধ করাযায় না। অহিংসার শক্তি হিংসার শক্তির চেয়ে অনেকগুণ বেশি।
গান্ধীজীর জীবন দর্শনের মূল ছিল আধ্যাত্ব চেতনা যা ছিল তাঁর প্রেরণা শক্তি। যে সত্যনিষ্ঠাকে তিনি ছেলেবেলা থেকে অনুসরণ করেছেন সেটাই তাকে পথ দেখিয়েছিল গভীর আধ্যাত্মিক বোধ ও বিশ্বাস।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও গান্ধীজী :
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গান্ধীজীর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বাধিক প্রভাব বিস্তারকারী। এই স্বাধীনতাযজ্ঞে তিনিই ছিলেন প্রধান ঋত্বিক।
১৯১৬ সালে নীলকরের অত্যাচারের প্রতিবাদে চম্পারণ তার সত্যাগ্রহ আন্দোলন, ১৯১১ সালে রাওলাট বিলের প্রতিবাদে হরতাল ঘােষণা, ১৯২০ সালে ‘খিলাফত আন্দোলন ও ওই সালে অসহযোগ-নীতি গ্রহণ এবংবিলাতী-বর্জন আন্দোলন প্রভৃতি দ্বারা তিনি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতন অধ্যায়ের সূচনা করেন।
১৯২৯ সাল পর্যন্ত তিনি খদ্দর ও চরকা প্রচারে ব্রতী হয়ে আন্দোলন চালান। ভারতকে স্বায়ত্ব-শাসন দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার গােলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেন গান্ধীজী বিলাত যান এবং ১৯৩৯ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে শূন্য হাতে ফিরে আসে।
১৯৪২ খৃষ্টাব্দে “ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গান্ধী ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে তার আত্মিক শক্তি দুর্জয় রূপ দেখিয়ে বিশ্ববাসীকে।চকিত করে দেন। বস্তুত এভাবে ধারাবাহিক আন্দোলনে ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তি।ত্বরান্বিত হয়েছে। তিনি জীবনে বহুবার কারাবরণ করেন।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ও গান্ধীজী :
গান্ধীজীর স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম তথা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু সরকার বদল বা শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের রাজনীতি নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে এক সুত্রে জড়িত।
তাই সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অসমতার বিরুদ্ধে তিনি অবতীর্ণ হয়েছিলেন প্রথম থেকে। ভারতবর্ষের মাটিতে এক নতুন সমাজতন্ত্রের সাধনার প্রবক্তা ছিলেন গান্ধীজী। শিল্পের বিকেন্দ্রীকরণ এবং ব্যাপক কুটির শিল্প স্থাপনের মধ্য দিয়ে ভারতে নব্য আর্থ সামাজিক কাঠামোর হদিশ দিয়েছেন তিনিই।
গান্ধীজী ও মানবপ্রেম :
গান্ধীজী ছিলেন প্রেমের পূজারী। তিনি মানবসেবক, তরি মানব প্রেম সমাজসেবার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছিল। তিনি হিন্দু-সমাজেরঅস্পৃশ্যতা-রূপ পাপ দূর করবার জন্য চষ্টা করে গেছেন। অস্পৃশাদের তিনি নাম দিয়েছিলেন হরিজন’।
হিন্দু ও মুসলমানদের সম্প্রীতিকে তিনি দৃঢ় করার প্রয়াস চালিয়ে গিয়েছিলেন। গ্রাম প্রধান ভারতের পুনর্গঠনের জন্যও তিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। ভারতবর্ষের সাত লক্ষ শ্রীহীন গ্রামের পূর্ব গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য তার অবদান স্মরণীয়।
উপসংহার :
গান্ধীজীর জীবন দর্শন ও ভারতাত্মা শাশ্বত বাণী সংহত মূর্তি। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে জানুয়ারি নাথুরাম গডসের পিস্তলের গুলিতে তার নশ্বর।দেহ লীন হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি চিরঞ্জীবী। আজও তার আরম্ভ করা কাজ সমাপ্ত হয়নি। ভারতের যতটুকু অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে, তা তারই প্রদর্শিত পথে এগিয়ে চলার ফল।
তবে এখনও অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে। দেশ থেকে দারিদ্র্য,অশিক্ষা, বিভেদ নীতি আর সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে হবে। তাহলে দেশ বাঁচবে, জাতি বাঁচবে,মানব সমাজ বিপদ মুক্ত হবে। আর এই সাধনায় গান্ধীজীর জীবন দর্শন হবে আমাদের পরম পাথেয়।
মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান প্রশ্নোত্তর
1. গান্ধীজি কবে এবং কোথায় জন্মস্থান করেন?
উত্তর- 2রা অক্টোবর, 1869 সালে, গুজরাটের পোরবন্দরে।
2. গান্ধীজির আসল নাম কী ছিল?
উত্তর- মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।
3. গান্ধীজির লেখা গ্রন্থগুলি হল?
উত্তর- হিন্দ স্বরাজ, সর্বোদয়।
4. গান্ধীজির রাজনৈতিক গুরু কে ছিলেন?
উত্তর- গোপালকৃষ্ণ গোখলে।
5. গান্ধীজির আধ্যাত্মিক গুরু কে ছিলেন?
উত্তর- টলস্টয়।
6. কাকে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের জনক বলা হয়?
উত্তর- গান্ধীজি।
7. কাকে ভারতের জাতির জনক বলা হয়?
উত্তর- গান্ধীজি।
8. ভারতের প্রথম জননেতা কাকে বলা হয়?
উত্তর- গান্ধীজি।
9. গান্ধীজিকে জাতির জনক বলে অভিহিত করেন কে?
উত্তর- সুভাষচন্দ্র বসু।
10. গান্ধীজিকে কোন নামে পরিচিত ছিলেন?
উত্তর- মহাত্মা, বাপু।
11. গান্ধীজিকে মহাত্মা উপাধি প্রদান করেন কে?
উত্তর- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
12. গান্ধীজিকে মিকিমাউস বলেছিলেন কে?
উত্তর- সরোজিনী নাইডু।
13. গান্ধীজিকে অর্ধনগ্ন ফকির বলেছিলেন কে?
উত্তর- চার্চিল।
14. গান্ধীজি কার দ্বারা প্রভাবিত হন?
উত্তর- টলস্টয়, রাস্কিন, থোরো, মাৎসিনি, যীশুখ্রিষ্ট, গৌতম বুদ্ধ।
15. গান্ধীজি কোন জৈন সন্ন্যাসীর দ্বারা প্রভাবিত হন?
উত্তর- বেচারামজী স্বামী।
16. গান্ধীজি সম্পাদিত পত্রিকা গুলি নাম কি?
উত্তর- ইয়ং ইন্ডিয়া এবং হরিজন।
17. সমাজের নিন্মবর্গীয়দের হরিজন নাম দেন কে?
উত্তর- গান্ধীজি।
18. গান্ধীজির জন্মদিনকে স্বরণীয় করতে কোন দিবস হিসাবে পালন করা হয়?
উত্তর- আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস।
19. গান্ধীজির জন্মদিনকে আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস হিসাবে ঘোষনা করে কে?
উত্তর- সাধারন সভা। (2007 সালে)
20. গান্ধীজিকে বাপু উপাধি প্রদান করেন কে?
উত্তর- ভারতের জনগন।
21. মহাত্মা শব্দের অর্থ কী?
উত্তর- মহৎ হৃদয় বা আত্মা।
22. বাপু শব্দের অর্থ কী?
উত্তর- পিতা বা বাবা।
23. আধুনিক ভারতের জনক কাকে বলা হয়?
উত্তর- গান্ধীজি।
24. “রাষ্ট্র হল সংগঠিত ও কেন্দ্রীভূত হিংসার প্রকাশ” -বক্তা কে?
উত্তর- গান্ধীজি।
25. আমার কল্পনায় গ্রাম স্বরাজ হল একটি পরিপূর্ন প্রজাতন্ত্র” -বক্তা কে?
উত্তর- গান্ধীজি।
26. “রাষ্ট্র হল এক হৃদয়হীন যন্ত্রস্বরূপ” -বক্তা কে?
উত্তর- গান্ধীজি।
