লিঙ্গ ও বচন বাংলা ব্যাকরণ শিক্ষায় লিঙ্গ ও বচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লিঙ্গ ও বচনের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। বাংলা ব্যাকরণের অন্যতম দুইটি বিষয় হলো এই লিঙ্গ ও বচন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা যেমন – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ইউনিট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বিসিএস সহ নানা চাকরি পরীক্ষায় বাংলা অংশে আমরা এই দুইটি বিষয় থেকে নানাভাবে প্রশ্ন আসতে দেখেছি। লিঙ্গ ও বচন থেকে সাধারণত কোন ধরণের প্রশ্ন এসে থাকে, এরকম নানা বিষয়গুলো নিয়েই আজকের এই লেকচার।
Table of Contents
লিঙ্গ ও বচন
লিঙ্গ
লিঙ্গ কথাটির অর্থ লক্ষণ বা নিদর্শন; এই লক্ষণ দেখিয়া যাবতীয় বিশেষ্য—শব্দকে আমরা মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করিতে পারি। (১) পুরুষ, (২) স্ত্রী ও (৩) ক্লীব অর্থাৎ যাহা পুরুষও নয়, স্ত্রীও নয়। সুতরাং লিঙ্গ তিনপ্রকার—পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ ও ক্লীবলিঙ্গ।
৭৫। পুংলিঙ্গ : যে শব্দে পুরুষজাতীয় জীব বুঝায় তাহা পুংলিঙ্গ। যেমন—পিতা, শিক্ষক, জ্ঞানবান্, মহাশয়, ছেলে, বাবা, রাজা, ব্যাঘ্র, মোরগ ইত্যাদি। ৭৬। স্ত্রীলিঙ্গ : যে শব্দে স্ত্রীজাতীয় জীব বুঝায় তাহা স্ত্রীলিঙ্গ। যেমন—মাতা, শিক্ষিকা, জ্ঞানবতী, মহাশয়া, মেয়ে, মা, রানী, ব্যাঘ্রী, মুরগী ইত্যাদি।

৭৭। ক্লীবলিঙ্গ : যে শব্দে পুরুষও বুঝায় না, স্ত্রীও বুঝায় না, তাহা ক্লীবলিঙ্গ। যেমন—গাছ, ফুল, ফল, দোয়াত, কলম, বই, কালি, জামা, জুতা, বাড়ি, ঘর, হাসি, কান্না, যাওয়া, আসা ইত্যাদি।
৭৮। উভয়লিঙ্গ : যে-সমস্ত শব্দে পুরুষও বুঝায়, স্ত্রীও বুঝায়, তাহাদিগকে উভয়লিঙ্গ বলে। কবি, কেরানী, শিশু, সন্তান, সন্ততি, অপত্য, শত্রু, বন্ধু, অন্ধ, খঞ্জ, পয়মন্ত, উত্তরপুরুষ, পূর্বপুরুষ, কীর্তনিয়া, ক্ষণজন্মা, শাস্ত্রবিদ্, ঔপন্যাসিক, উদারচেতা, বাস্তুহারা, মাতৃহারা, আত্মহারা, চিত্রতারকা, অধরা, ভাস্কর, নীচমনা, আত্মভোলা, মালিক, সবজান্তা, রোগা, রাঁধুনী, রাগী, চালাক ইত্যাদি। “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।” “চণ্ডীদাস আর রজকিনী এরাই প্রেমের শিরোমণি।”
লক্ষ্য কর, প্রাণিবাচক শব্দেরই পুংলিঙ্গ বা স্ত্রীলিঙ্গ হয়; আর অপ্রাণিবাচক জড় পদার্থ বা ভাব বুঝাইলে ক্লীবলিঙ্গ হয়।
সংস্কৃতেও পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ এবং ক্লীবলিঙ্গ—এই তিনটি লিঙ্গ আছে। কিন্তু লিঙ্গবিচারে সংস্কৃত বাংলা ভাষার মতো বাস্তববাদী নয়, বহুলাংশে কল্পনাবিলাসী। বাংলায় লিঙ্গনির্ণয় করা হয় শব্দটির অর্থবিচার করিয়া, কিন্তু সংস্কৃতে অর্থবিচার না করিয়া শব্দের গঠন-প্রকৃতির উপরই বিশেষ নির্ভর করা হয়। কোন্ কৃৎ-প্রত্যয় বা তদ্ধিত-প্রত্যয়ের যোগে শব্দটি গঠিত, কিংবা কোন্ সমাসের আওতায় শব্দটির সৃষ্টি—এইসমস্ত প্রশ্নই সেখানে মুখ্য হইয়া উঠে।
ফলে, পুরুষ বুঝাইলেই কোনো শব্দ যে পুংলিঙ্গ হইবে, কিংবা স্ত্রী বুঝাইলেই শব্দটি যে স্ত্রীলিঙ্গ হইবে, অথবা স্ত্রীপুরুষ কোনোকিছু না বুঝাইলেই শব্দটি যে ক্লীবলিঙ্গ হইবে, এরূপ কোনো সহজ নিয়ম আমরা সেখানে পাই না। ভোগ ত্যাগ যোগ স্তব প্রভৃতি অপ্রাণিবাচক শব্দও সংস্কৃতে পুংলিঙ্গ। স্ত্রীবাচক দার, স্ত্রীলোক শব্দগুলিও পুংলিঙ্গ। আবার স্ত্রীবাচক কলত্র শব্দটি ক্লীবলিঙ্গ। অথচ নদী, লতা, গতি প্রভৃতি শব্দ সত্যকার স্ত্রীকে না বুঝাইলেও স্ত্রীলিঙ্গ। তাই সংস্কৃতে লিঙ্গবিচার নিঃসন্দেহে জটিল ব্যাপার।
বচন
‘বচন’ ব্যাকরণের একটি পারিভাষিক শব্দ। এর অর্থ সংখ্যার ধারণা। ব্যাকরণে বিশেষ্য ও সর্বনামের সংখ্যার ধারণা প্রকাশের উপায়কে বচন বলে। যার দ্বারা ব্যক্তি,বস্তু ইত্যাদি সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় তাকে বচন বলে। অন্যভাবে বলা যায়, যা একত্বের বা বহুত্বের ধারণা দেয় তাকে বচন বলে। শুধু বিশেষ্য ও সর্বনাম শব্দের বচনভেদ হয়। দ্রব্য, গুণ ও ক্রিয়াবাচক বিশেষ্যের বহুবচন হয় না।
বাংলা ভাষায় বচন দুই প্রকার। যথাঃ
ক. একবচন
খ. বহুবচন
একবচন
যে শব্দ দ্বারা কোনো প্রাণী, বস্তু বা ব্যক্তির একটিমাত্র সংখ্যার ধারণা হয়, তাকে একবচন বলে। যেমন- সে এলো। মেয়েটি স্কুলে যায়নি। পদের আগে একটি, একটা,একজন,একখানা,প্রভৃতি শব্দ বসিয়ে এবং বিশেষ্য পদের শেষে টি,টা,খানা,খানি,গাছা,গাছি ইত্যাদি শব্দ যোগ করে একবচন বোঝানো যায়।
একবচনের কয়েকটি নিয়ম
(ক) সাধারণত মূল শব্দটি ব্যবহার করেই একবচন বোঝানো হয়। যেমন : ফুল, ফল, হাঁস, কলম, ছেলে, মেয়ে ইত্যাদি।
(খ) পদের আগে ‘এক’ বা ‘একটি’ বসিয়ে একবচন বোঝানো হয়। যেমন : এক টাকা; এক ব্যক্তি; একটি হাঁস; এক মাস ইত্যাদি।
(গ) বিশেষ্য পদের সাথে টি, টা, খানা, খানি, গাছা, গাছি ইত্যাদি যোগ করে একবচনের ভাব বোঝানো হয়। যেমন : ছেলেটি, মেয়েটা, বইখানা, মুখখানি, ঝাঁটাগাছা, মালগাছি ইত্যাদি।
বহুবচন
যে শব্দ দ্বারা কোনো প্রাণী, বস্তু বা ব্যক্তির একের অধিক অর্থাৎ বহু সংখ্যার ধারণা হয়, তাকে বহুবচন বলে। যেমন- তারা গেল। মেয়েরা এখনও আসেনি।

বাংলায় বহুবচন বোঝানোর জন্য কয়েকটি রীতি আছে। যেমন :
সংখ্যাবাচক কিংবা সমষ্টিবাচক শব্দ ব্যবহার করে। যেমন : দশটা গাড়ি; পাঁচ বস্তা চাল; এক ধামা ধান; গাড়ি ভরতি লোক; যতসব দুষ্টু ছেলে। লক্ষণীয়: মূল শব্দটির এক বচনের রূপই থাকছে। তবে দশটি গাড়িগুলো – এরকম হয় না । প্রাণিবাচক ও অপ্রাণিবাচক এবং ইতর প্রাণিবাচক ও উন্নত প্রাণিবাচক শব্দভেদে বিভিন্ন ধরনের বহুবচনবোধক প্রত্যয় ও সমষ্টিবোধক শব্দ যুক্ত হয়।
