দ্বিরুক্ত শব্দ ও পদাশ্রিত নির্দেশক | বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, বিসিএস প্রস্তুতি

দ্বিরুক্ত শব্দ ও পদাশ্রিত নির্দেশক নাম শুনে বিষয় গুলো কঠিন মনে হলেও, আসলে কিন্তু খুবই সহজ। বাংলা ব্যাকরণের (Bangla Byakoron / Grammar) মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে দ্বিরুক্ত শব্দ (Dirukto Shobdo) ও পদাশ্রিত নির্দেশক (Podasrito Nirdeshok) অন্যতম। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা যেমন – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ইউনিট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বিসিএস প্রস্ততি সহ নানা চাকরি পরীক্ষায় বাংলা অংশে আমরা এই দুইটি বিষয় থেকে নানাভাবে প্রশ্ন আসতে দেখেছি। সাধারণত কোন ধরণের প্রশ্ন, কি কি রকমভাবে এই বিষয়গুলো থেকে এসে থাকে, সেসব নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে এই ক্লাসে।

 

দ্বিরুক্ত শব্দ ও পদাশ্রিত নির্দেশক

দ্বিরুক্ত শব্দ

 

দ্বিরুক্ত শব্দ কাকে বলে

দ্বিরুক্ত অর্থ দু’বার উক্ত বা বলা হয়েছে এমন। বাংলা ভাষায় কোনো কোনো শব্দ একবার ব্যবহার করলে যে অর্থ প্রকাশ করে সেগুলো দু’বার ব্যবহার করলে অন্য কোন সম্প্রসারিত বা সংকুচিত অর্থ প্রকাশ করে। এ ধরনের শব্দের পরপর দু’বার প্রয়োগেই দ্বিরুক্ত শব্দ গঠিত হয়। যেমন— আমার ঘুম ঘুম লাগছে। অর্থাৎ ঠিক ঘুম নয়, ঘুমের ভাব অর্থে এই প্রয়োগ করা হয়েছে।

 

লিঙ্গ ও বচন

 

দ্বিরুক্ত শব্দের গঠনগত দিক

গঠনগত দিক থেকে বাংলা ভাষার দ্বৈতশব্দ বা দ্বিরুক্ত শব্দকে তিনভাগে ভাগ করা যায় :

  1. একই শব্দের পুনরাবৃত্তি/শব্দের দ্বিরুক্তি
  2. পদের দ্বিরুক্তি
  3. অনুকার দ্বিরুক্তি/ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি

১. শব্দের দ্বিরুক্তি

একই শব্দ যখন অবিকৃতভাবে দু’বার উচ্চারিত হয় তখন তাকে শব্দের দ্বিরুক্তি বলে। শব্দের দ্বিরুক্তিতে কোন পদের পরিবর্তন হয় না, কেবল অর্থের পরিবর্তন হয়।যেমন—দিন দিন, রোজ রোজ, লাল লাল, কেউ কেউ, পাকা পাকা ।

শব্দের দ্বিরুক্তি নানা রকম হতে পারে

ক. একই শব্দ দু বার ব্যবহার করে এবং শব্দ দুটি অবিকৃত রেখে । যেমন-: গলায় গলায় ভাব। চলতে চলতে একদিন জীবন থেমে যাবে। তার টুকরো টুকরো স্মৃতি আজও আমাকে ব্যথাদান করে।
খ. একই শব্দের সাথে সমার্থক আর একটি শব্দ যোগ করে। যেমন : মান- সম্মান, হিসাব-নিকাশ, ভয়-ভীতি ৷
গ. দ্বিরুক্ত শব্দ-জোড়ার দ্বিতীয় শব্দটির আংশিক পরিবর্তন করে। যেমন- ডাকাডাকি, হাঁকাহাঁকি, ভাগাভাগি ইত্যাদি ।
ঘ. সমার্থক বা বিপরীতার্থক শব্দযোগে। যেমন : রাস্তা-ঘাট, রীতি- নীতি, লাজ-লজ্জা ইত্যাদি।

দ্বিরুক্তি শব্দ বাক্যে প্রয়োগ

  1. গলায় গলায় : রহিম ও করিমের গলায় গলায় ভাব।
  2. বন্ধু-বান্ধব : বন্ধু-বান্ধব সব ছেড়ে নির্বাসনে যাচ্ছি।
  3. রোগ-শোক : রোগ-শোকের সাথে নিত্য বসতি জেলেপাড়ার লোকদের।
  4. ভয়-ডর : দস্যি ছেলেটার নাহি আছে ভয়-ডর।
  5. হিসাব-নিকাশ : জীবনের খাতায় হিসাব-নিকাশ করে ফলাফল হলো শূন্য।
  6. কুলি-মজুর : কুলি-মজুরের গান গেয়ে যাই ভালোবাসি কুলি-মজুরকে।
  7. লাজ-লজ্জা : লাজ-লজ্জা রেখে এলাম, বলতে এলাম ভালোবাসি।
  8. দিনে দিনে : দিনে দিনে সময় গিয়েছে চলে আসনি তুমি কাছে।
  9. দোষ-গুণ : দোষে-গুণেই মানুষ হয় পূর্ণ মানুষ ।
  10. শীত-বসন্ত : শীত-বসন্ত চলে গিয়ে আজ এসেছে বর্ষা রাতি প্রেয়সী আমার সেই যে গিয়াছে এখনো আসেনি ফিরি।

পদাশ্রিত নির্দেশক

পদাশ্রিত নির্দেশক, সংক্ষেপে নির্দেশক, বলতে বাক্যে ব্যবহৃত সেসব শব্দাংশকে বোঝায় যেগুলো বিশেষ্য বা বিশেষণ পদের পরে বা “আশ্রয়ে” সংযুক্ত হয়ে উক্ত পদের নির্দিষ্টতা বা অনির্দিষ্টতা বোঝায়। এগুলো মূলত অব্যয় পদ, তাই এদের পদাশ্রিত অব্যয়ও বলে। বাংলা ও অসমীয়া ভাষায় নির্দেশকগুলো প্রত্যয় হিসেবে পদের পরে বসে, তাই উক্ত ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে পদাশ্রিত নির্দেশককে নির্দেশক প্রত্যয়বলা যায়। পদাশ্রিত নির্দেশক ব্যাকরণিক বর্গ গঠনে ভূমিকা রাখে।

বাংলা ভাষায় সাধারণত ব্যবহৃত নির্দেশকগুলো হলো – -টা, -টি, -টে -টু, -টুক, -টুকু, -টুকুন, -গুলা, -গুলি, -গুলো, -খান, -খানা, -খানি, -গাছ, -গাছা, -গাছি, -জন, -এক। বাংলা ব্যাকরণে নির্দেশকসমূহ লগ্নক শ্রেণিভুক্ত।“পদাশ্রিত নির্দেশক হচ্ছে খাঁটি বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পদ।”

 

প্রকারভেদ

নির্দিষ্টতাবাচক

নির্দিষ্টতাবাচক নির্দেশক বিশেষ্য, সর্বনাম বা বিশেষণ পদ বা বর্গের পরে বসে পদ বা বর্গটিকে নির্দিষ্টতা প্রদান করে। বাংলা এ ধরনের নির্দেশকের মধ্যে রয়েছে – -টা, -টি, -টো, -টে, -টু, -টুক, -টুকু, -টুকুন, -গুলা, -গুলি, -গুলো, -খান, -খানা, -খানি, -গাছ, -গাছা, -গাছি, -জন।

  • একটি বিশেষ্য, সর্বনাম ও বিশেষণ পদ বা বর্গকে নির্দিষ্ট করে বোঝাতে -টা, -টি, -খানা ও -খানি নির্দেশক বসে, রূপান্তর: -টো ও -টে এবং -খান। উদাহরণ: বইটা, বইখানি, দিনটি, একটি, একখানা, একখান, দুটো, তিনটে। স্বল্পতা বোঝাতে অগণনযোগ্য নামপদের পর -টুক বসে, রূপান্তর: -টু, -টুকু। উদাহরণ: একটু, এইটুক, ভাতটুকু।
  • একের বেশি বিশেষ্য, সর্বনাম ও বিশেষণ পদ বা বর্গকে নির্দিষ্ট করে বোঝাতে -গুলা, -গুলি নির্দেশক বসে। এর রূপান্তর: -গুলো। যেমন: বইগুলা, এগুলো, সেগুলি। আধিক্য বোঝাতে বিশেষত “লম্বা বা সরু” নির্দেশ করে এমন অগণনযোগ্য নামপদের পর -গাছ বসে, রূপান্তর: -গাছা, -গাছি। উদাহরণ: একগাছ, চুলগাছা।
  • এক বা একের বেশি মানুষ বোঝাতে বিশেষ্য, সর্বনাম বা বিশেষণ পদ বা বর্গের পর -জন নির্দেশক ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ: লোকজন, সেইজন, অনেকজন, কয়জন৷

অনির্দিষ্টতাবাচক

অনির্দেশক প্রত্যয় এমনই একটি নির্দেশক প্রত্যয় যেটি অনির্দিষ্টতাবাচক বিশেষ্য, সর্বনাম বা বিশেষণ পদ বা বর্গের পরে বসে। এই প্রত্যয় দিয়ে সাধারণত সংখ্যা বা পরিমাণের অনির্দিষ্টতা বোঝায়। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত একমাত্র অনির্দেশক প্রত্যয় হলো -এক। নিচের উদাহরণে ব্যবহৃত দশেক (দশ্‌ + -এক্‌) বলতে কমবেশি দশ বোঝায় বলে এখানে -এক একটি অনির্দেশক প্রত্যয়।[৫]

জন দশেক ছাত্র।

-এক প্রত্যয়টিকে -টা বা -খান নির্দেশকের পরে যুক্ত হয়ে -টাক (-টা + -এক্‌) ও -খানেক (-খান্‌ + -এক্‌) – দুটি সাধিত নির্দেশক তৈরি করে। নিচের দুটি উদাহরণে উক্ত নির্দেশক দুটির প্রচলিত ব্যবহার দেখানো হলো।[৫]

মাইলটাক গিয়ে পেয়ে গেলাম
ঘণ্টাখানেক হলো বসে আছি।

 

দ্বিরুক্ত শব্দ

 

শূন্য

শূন্য নির্দেশক হলো বাক্যে পদাশ্রিত নির্দেশকের অনুপস্থিতি। যেসব নির্দিষ্টতাবাচক নির্দেশক আছে সেখানে কোনো বাক্যে বা পদ/বর্গের সঙ্গে নির্দেশকের অঅনুপস্থিতি বিশেষভাবে নির্দেশ করে যে পদটি “অনির্দিষ্টতাবাচক”। যেসব ভাষায় অনির্দিষ্টতাবাচক নির্দেশক বিরল বা নগণ্য (যেমন: বাংলা), সেখানে শূন্য নির্দেশক বিশেষভাবে অনির্দিষ্টতাবাচক নির্দেশকের কাজ করে। নিচের উদাহরণে দর্শনার্থীরা ও কাদা পদ দুটির পরিমাণ অনির্দিষ্ট, কিন্তু এখানে কোনো নির্দেশক যুক্ত হয় নি।

দর্শনার্থীরা কাদায় হাঁটা শেষ করলেন।

 

দ্বিরুক্ত শব্দ ও পদাশ্রিত নির্দেশক নিয়ে বিস্তারিত :

Leave a Comment